বিশ্বকবি, বিশ্ববিজ্ঞান ও বিশ্বরহস্য
বিংশশতাব্দীর মহাদিকপাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এবং বিশ্ববিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫)। প্রাচ্যের কবি ১৯১৩ সালে, আর পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানী ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন। গত শতাব্দীর বিশের দশকের আগে এদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু উভয়ই উভয়কে জানতেন। তাঁদের চলার পথ ভিন্ন হলেও সত্যসন্ধানে তাঁরা ছিলেন একই আলোর পথযাত্রী। সত্য ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠায় তাঁরা প্রয়াসী ছিলেন। মানবতার সুমহান আদর্শকে তাঁরা উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। দু দুটি বিশ্বযুদ্ধের ফলে বিশ্বজোড়া অনাহার, অবদমন ও অশান্তির প্রতিটি দিকেই ছিল তাঁদের সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তাছাড়া স্ব-স্ব দেশে নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁরা প্রতিবাদ করেছেন এবং জনমত গঠনের প্রচেষ্টা নিয়েছেন। ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ জালিয়ানওয়ালাবাগের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছেন এবং ইংরেজের দেওয়া নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আইনস্টাইও ফ্যাসিস্ট হিটলার বাহিনীর ইহুদি নিধনযজ্ঞের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছেন। কবি ও বিজ্ঞানীর মত ও পথের দিকটি ভিন্ন হলেও মানবকল্যাণ, শান্তি ও প্রগতি চিন্তা-চেতনায় তাঁদের সীমাহীন আগ্রহ ছিল। বিশ্বরহস্য অন্বেষণে তাঁরা আজীবন নিরলসভাবে সাধনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ কোলকাতার জোড়াসাঁকোতে এবং আইনস্টাইনের জন্ম ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির উলম শহরে। বিগত শতাব্দীর বিশ-ত্রিশের দশকে অন্তত চারবার তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনবার জার্মানিতে-১৪ জুলাই ১৯২৫, ১৯ আগস্ট ১৯৩০ ও ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, এবং আমেরিকায় ১৫ ডিসেম্বর ১৯৩০। প্রথম দুবার তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। আলোচনায় কণাজগৎ থেকে শুরু করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পর্যন্ত কোনো কিছুই বাদ যায় নি। কবির দৃষ্টিতে বিশ্বনান্দনিকতার সুর ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ বাণীর মধ্যে নিহিত। আর বিশ্ববিজ্ঞানী বোঝাতে চেষ্টা করেছেন ‘সত্যম শিবম অদ্বৈতম’। উভয় উপলব্ধিই বিশ্বরহস্যের গভীরতম সত্য থেকে উৎসারিত। আইনস্টাইন বললেন, অণুপরমাণুর জগৎ থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অমোঘ নিয়মের কথা। আর রবীন্দ্রনাথ বলতে চেয়েছেন মানবলোকের বিচিত্র উপলব্ধির কথা; যা চৈতন্যের আলোয় পথ চিনে নিতে সন্ধান করে অনন্ত বিশ্বরহস্যের। সেদিনকার এ-সাক্ষাৎকারে তাঁদের মধ্যে সববিষয়ে ঐকমত্য না হলেও সুন্দরের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন মানবচৈতন্যের কথা। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘মানুষের চৈতন্য হলো পরম সত্য। মানুষের মনপ্রাণ, তার চৈতন্য বাদ দিলে মূল্যবোধই বা কি, গণিতের সিদ্ধান্তই বা আসবে কোথা থেকে? চৈতন্যজ্ঞান-সত্য যখন পরম সত্য, তখন তার সঙ্গে আর সব সত্য জড়িত ও এক।’ কিন্তু প্রকৃতির সত্যান্বেষী আইনস্টাইনের কারবার ছিল বিশ্বের পরিচিত নিয়মের সঙ্গে। তাই তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘মানুষ না থাকলেও অঙ্কের নিয়ম থাকে, মানুষের চৈতন্যের বাইরেও বিশ্বের অস্তিত্ব রয়েছে।’ তাছাড়া সত্য কি মানব-নিরপেক্ষ বা মানব-নির্ভর—এই চিরন্তন প্রশ্নই ছিল তাঁদের বাক্যালাপের প্রধান বিষয়। এখানে তাঁদের মধ্যকার কিছু সংলাপ তুলে ধরা হলো:
র: গণিতের শর দিয়ে আপনি দুটি প্রাচীন সত্তা (Entity) দেশ ও কাল-কে বিদ্ধ করার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন, আর আমি এদেশে মানুষের শাশ্বত জগৎ, বাস্তবতার বিশ্ব, এসব নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছি।
আ: আপনি কি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন দিব্যসত্তায় (উরারহব) বিশ্বাস করেন?
র: ঠিক বিচ্ছিন্ন নয়। ব্রহ্মাণ্ড মানুষের অনন্ত ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিধৃত। এমন কোনো কিছুই থাকতে পারে না, যা কিনা মানব-ব্যক্তিত্বের অধীন নয়, আর তা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে ব্রহ্মাণ্ডের সত্যও মানবীয় সত্য।
আ: ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি বিষয়ে দুটি ভিন্ন ধারণা আছে—বিশ্ব মানবের ওপর নির্ভরশীল একক সমগ্র এবং বিশ্বের বাস্তবতা মানবসত্তা-নিরপেক্ষ।
কিছুক্ষণ আলোচনার পর আবার আইনস্টাইন প্রশ্ন করলেন—
আ: তাহলে সত্য কিংবা সৌন্দর্য মানব-নিরপেক্ষ নয়?
র: না, আমি তা বলব না।
আ: যদি কোনো মানুষ আর না থাকে, তখন কি অ্যাপোলো বেলভেডিয়ার আর সুন্দর থাকবে না?
র: না!
আ: সৌন্দর্য সম্বন্ধে এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত,
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments